তুমি যেখানেই থাকো ফিরে আসো
বেশিরভাগ মানুষই তাদের ছোটবেলার স্বপ্নময় অতীতে ফিরে যেতে চায়। কিন্তু আমি সচেতনভাবেই কখনো আমার ছোটবেলায় ফিরে যেতে চাই না। কারণ আমার ছোটবেলাটা ছিল বিভীষিকাময়।
আমার বয়স যখন প্রায় ৭-৮ বছর, তখন আমার এক ভাই হারিয়ে যায়। ‘হারিয়ে যাওয়া’ কথাটা হয়তো একটু অবাক লাগার মতই। একটু খোলাসা করেই বলি। আমার বড় দু’ভাই। বড়ভাই আমার চেয়ে প্রায় তের বছরের এবং ছোটভাই সাত বছরের বড়। আজ থেকে প্রায় বছর চল্লিশেক আগে এক শবে-বরাতের রাতে বাসা থেকে রাগ করে আমার ছোটভাই বেরিয়ে গিয়েছিল, সে আর কোনদিন ফেরেনি। খুব সামান্য একটা বিষয় থেকে এই ঘটনার শুরু – আমাদের এক আত্মীয় সেইরাতে আমার ভাইকে নিয়ে দাবা খেলতে বসায় আমার আব্বা রাগ করেন এবং এক পর্যায়ে তাকে একটা চড় দেন। আমার ভাইয়ের জীবনে সেটা ছিল বাবার প্রথম এবং একমাত্র চড়। এই অপমান মেনে নিতে না পেরে ষোল বছরের সদ্য যুবক সেই যে বাড়ি ছাড়ল, আর কখনও ফেরেনি!
এমন অকল্পনীয় দূর্ঘটনায় আমার বাবা-মা ভীষণ ভেংগে পড়লেন। সেসময়কার রেডিও, টিভি, পত্রিকায় অসংখ্যবার প্রচারিত ‘নিঁখোজ সন্ধানের’ বিজ্ঞপ্তি এবং বাংলাদেশের প্রতিটি থানায় পাঠানো ‘কোন সহৃদয় ব্যক্তি যদি সন্ধান পান’ শীর্ষক নোটিশের কোন উত্তর মেলেনি।
প্রথম ধাক্কার বিস্তর খোঁজাখুঁজির ব্যর্থতার পরের দফায় শুরু হলো নানা ধরণের গায়েবী চেষ্টা। শুরু হলো তদবির – তাবিজ – কবজ- পানিপড়া – আয়না পড়া, বাটি চালান, জ্বীন হাজিরা আরো কত কী! আমি তখন বেশ ছোট। সবটা পুরোপুরি ভাবে মনে নেই। যেটুকু মনে আছে, সেটুকু থেকে কিছু অংশ লিখছি।
মা-বাবার মানসিক দূর্বলতার সুযোগে শুরু হলো বাড়িতে নানাধরণের – নানামহলের লোকজনের আনাগোনা। আমার বাবা কোত্থেকে যেন কাঠের বানানো এক চরকা নিয়ে হাজির হলেন। তাতে তাবিজ বেঁধে নাবালককে দিয়ে প্রতিদিন চল্লিশবার করে সোজা এবং পরবর্তী চল্লিশবার উল্টো ঘোরালে তবেই নাকি চল্লিশদিন বাদে আমার ভাই ফেরত আসবে। নাবালক হিসেবে আমি এই চরকা ঘোরানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত হলাম। প্রতিদিন চরকা ঘোরাতে ঘোরাতে আমার কচি হাতে প্রায় কড়া পরে গেল! এখন বুঝি যে অর্ডার দিয়ে বানানো সেই কাঠের চরকা সম্ভবতঃ ব্যবহার উপযোগী মসৃণ ছিল না। মোটামুটি গায়ের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে তা ঘোরাতে হতো। যাহোক প্রতিদিন আমার মা ক্যালেন্ডারে দাগ কেটে চল্লিশ দিন পার করলেও আমার ভাই ফিরে এলো না।
পাশাপাশি নানা ধরণের তাবিজ গাছে ঝোলানো কিম্বা কবুতরের পায়ে বাঁধা চলছিল। এরমাঝেই একদিন হাইকোর্টের মাজার থেকে একজনকে বাসায় নিয়ে আসা হলো। তিনি পঁচিশগজ মার্কিন কাপড় গায়ে জড়িয়ে চল্লিশ দিনের জন্য ‘নিঃশব্দ’ ধ্যানে বসলেন। তিনি কোন কথা বলেন না, তবে কাগজে বিভিন্ন নির্দেশনা লিখে পাঠান। আমার বড়ভাই সেই নির্দেশনা অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেন। বিভিন্ন নির্দেশনার মধ্যে নানান সাদকার পাশাপাশি বিভিন্নরকম কার্যক্রম থাকতো। একবার নির্দেশনা আসলো ‘কমপক্ষে একমনি’ ওজনের একটা পাথর সংগ্রহ করে তাতে একটা তাবিজ চাপা দিতে হবে। সমস্যা বাঁধলো এত বড় পাথর কোথায় পাওয়া যাবে এবং সেটা যে একমনি হবে সেটা কীভাবে বোঝা যাবে! আমার ভাই তার একান্ত সহযোগী গ্রাম সম্পর্কিত এক ভাইকে নিয়ে সেই তথাকথিত পাথরের সন্ধানে বের হলেন। ততকালীন বিডিআর এর মোড়ে সেসময় কন্সট্রাকশানের কাজ চলছিল, সেখানে কিছু বড় পাথরের সন্ধান পাওয়া গেল। তবে চাইলে পাথর পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, অতএব চুরিই সই। তারা দুজন একটা ততকালীন বেবিট্যাক্সি নিয়ে কোনভাবে একটা পাথর তুলে নিয়ে সেখান থেকে চম্পট। অতঃপর সেটাকে রেশনের দোকানে নিয়ে বিশাল আকারের কাঠের দাঁড়িপাল্লায় মেপে অবশেষে বাড়ি এনে তাবিজ চাপা দিয়ে ক্ষান্ত দিলেন। এরপরের নির্দেশিকা ছিল আরেক কাঠি বেশি। চারটে পাখির ডানায় তাবিজ বেঁধে ঠিক মাগরিবের সময় চিড়িয়াখানায় গিয়ে পাখিগুলো ছেড়ে দিতে হবে। তবে সারাদেশে এত জায়গা থাকতে চিড়িয়াখানা কেন, সেটা আমার জানা নেই! আমার বড়ভাই বিনা বাক্য ব্যয়ে যথারীতি তাবিজ সমেত একহালি পাখি নিয়ে ভরসন্ধ্যায় চিড়িয়াখানায় গিয়ে হাজির। ঢোকার মুখে তাকে আটকানো হলো। একে ভিতরে ঢোকার সময় প্রায় শেষ তারপরে পাখি নিয়ে ঢোকার বিষয়টা পুরোপুরি সন্দেহজনক। যাহোক একপর্যায়ে রফা করে সে পাখিগুলোকে নিয়ে সেখানে ছেড়ে দিয়ে আসলো।
ক্যালেন্ডারের পাতায় এবারের চল্লিশ দিনও শেষ। অবশেষে চল্লিশতম দিনে তিনি ঘর থেকে বের হয়ে প্রথম মুখ খুলে আমার মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে বললেন, এটা ছিল তার প্রথম জীবনের তদবির। এইসময় জীব হত্যার কোন নিয়ম নাই। কিন্তু তিনি মশা এবং পিপড়া মেরেছেন বলে তার তদবির কার্যকর হয়নি।
আমরা নিত্যনতুন অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। তখন তুলা রাশির লোকের ব্যাপক চাহিদা। তবে অনথ্যায় নাবালক হলেও চলে। তারা আয়না বা নখে পড়া তেল দিয়ে অনেক ‘অদেখা’ দেখতে পায়। এবারও আমি। আমাকে বারান্দায় বসিয়ে নখে তেল দিয়ে গভীর মনযোগে দেখতে বলা হলো। আমি বারান্দার উল্টো দিকের তিনতলা ছায়া ছাড়া কিছুই দেখলাম না। আমার মা-বাবা প্রচন্ড উৎকন্ঠায় অপেক্ষা করছেন। যিনি আমার নখে তেল দিয়ে বসিয়ে ছিলেন তিনি আমাকে বিভিন্নভাবে প্রম্পট করছেন আর আমি কোনকিছু না দেখায় একসময় নিজেকে ভীষণ অপরাধী ভাবতে শুরু করলাম। হঠাৎ একটা অপ্রত্যাশিত কাজ করে বসলাম- আমি তখন মিথ্যা বলা শুরু করলাম। আমি কল্পনায় আমার ভাইকে দেখতে থাকলাম আর বানিয়ে বানিয়ে বিভিন্ন কিছু বলতে থাকলাম। আড়চোখে দেখলাম আমার মা স্বস্তির সাথে চোখ মুছলেন – যাক অন্তত এবার তার মেয়ে নিজের চোখে তার হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে দেখেছে। আমি বহু বছর এই মিথ্যে বলার অপরাধবোধে ভুগেছি। আজ এত বছর পরে এই সত্যটা প্রথমবারের মত বলছি শুধুমাত্র আমার মা বেঁচে নেই বলে। এরপরে বহুবার আমার মা আমাকে জিগেস করে নিশ্চিত হয়েছেন যে, আমি আমার ভাইকে দেখেছি। আমি প্রতিবারই মিথ্যে বলেছি। বড় হয়ে বুঝেছি, মিথ্যা বলার অপরাধবোধের চাইতে আমার মায়ের প্রশান্তিটা অনেক বড়। ঘটনাক্রমে গতকালই আমার বড়ভাইয়ের সাথে বসে যখন পুরনোদিনের স্মৃতিচারণ করছি তখন সে আমাকে আবারও জিগেস করলো, ‘তুইও তো দেখসিস, তাইনা?’ এবার আমি উত্তর না দিয়ে অন্য প্রসংগে গেলাম। এই মিথ্যার বোঝা আমার জন্যে অনেক বেশি ভারী হয়ে যাচ্ছে!
যাহোক আবারও প্রসঙ্গে ফিরে যাই। জ্যোতিষবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, আংটি- পাথর, হাতদেখা, কুষ্ঠি, কোনকিছুই বাদ যায়নি। এমনকি আমার বাবা আমাদের সবার কুষ্ঠি পর্যন্ত করেছিলেন। অনেকটা নরেশ – পরেশ অবস্থা। আমাদের বাসায় এবার যিনি আসলেন তিনি ‘ভর’ -এ বসেন। এমনকি মা কালীর সান্নিধ্যও তার কাছে কোন ব্যাপার না। ‘ভর’ – এর রাতে আমি ভয় পাবো ভেবে আমার মা আমাকে নীচের তলায় ঘুমাতে পাঠালেন, বাকিটা আমার জানা নেই।
বিভিন্ন ঘরানায় আমাদের বিচরনে আমার মায়ের সাথে পুরনো ঢাকার র্যাংকিন স্ট্রিটের এক পরহেজগার ‘আম্মাজী’র কথা মনে পড়ে। তিনি আম্মাকে একটা কথাই বারবার বলতেন, ‘দোয়া করেন, মায়ের দোয়াই সবচেয়ে বড়।’
অসংখ্য বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে গেলেও যে ঘটনাটা আমাকে সবচেয়ে আলোড়িত করে সেটা এখন বলবো। এবার একজনের আগমন ঘটলো যিনি দাবী করলেন যে, তার আধ্যাত্মিক শক্তিবলে আমার ভাইয়ের অবস্থান চিহ্নিত করে, তদবিরের প্রভাবে তাকে ঘরে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। তিনি তার আধ্যাত্মিক শক্তিবলে আমার ভাইকে দেখতে পেলেন নাভারনের কাছে। তিনি তদবিরের মাধ্যমে সেখান থেকে তাকে রাজশাহী হয়ে নদী পার করে নিয়ে আসতে থাকলেন ঢাকার দিকে। আমার মাকে আপডেট জানান কয়েক ঘন্টা অন্তর অন্তর। আমার মা প্রচন্ড অস্থির। ছেলে ঘরে ফিরবে এতদিন পরে! যখন শুনলেন আমার ভাই মানিকগঞ্জ পেরুচ্ছে, উনি তাড়াতাড়ি করে কৈ মাছের ঝোল রান্না করলেন গরম ভাত দিয়ে খাওয়ার জন্য। কিছুক্ষণ বাদে খবর আসলো সে গাবতলির কাছাকাছি। এরপরে কি হলো আমার তা’ জানা নেই। শুধু দেখলাম আম্মা কী যেন একটা শুনে আর্তস্বরে চিৎকার করে সোজা রান্নাঘরে ঢুকে রান্না কৈ মাছগুলো ময়লার বালতিতে ফেলে দিলেন! আম্মা কি শুনেছিলেন তা আমি কখনও জানতে চাইনি।
এই ঘটনার পরমুহূর্তে আমি এক ধাক্কায় অনেক বড় হয়ে গেলাম। আমার জীবনে আর কোন কৈশোর থাকল না। আমি বুঝলাম বাস্তবই সব। বাস্তবকে মেনে নিতে না পারলে প্রতিমুহূর্তে প্রতারিত হতে হয়। এরপর থেকে আমার আর কোন প্রত্যাশা নেই।
আমি সত্য মেনে নিলেও আমার পিএইচডি করা ডাক্তার ভাই তার এই বয়সে এসেও সেটা পারেননি। এখনও সে আমাকে মাঝে মাঝেই বলে ছোটভাই ফিরে আসলে সে তাকে কী কী বলে বকবে। আমি নীরবে শুনি, উত্তর দেই না৷ বেশ ক’বছর আগে আমাদের বাবা যখন ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুশয্যায় তখন সে আবারও পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিল, ‘তুমি যেখানেই থাকো, ফিরে আসো’।
Suja
May Allah save him.
hasinjahan
Thanks!
হাসিন জাহান
ধন্যবাদ!
MD.MASUM HOSSAIN
I have lost my sense, how can I express my opinion on it? Really it is rare and undoubtedly repairable loss of your family. I can’t believe how Aunt was alive without his son. May Allah bless him who didn’t return back.
hasinjahan
Thanks Bhai
হাসিন জাহান
দোয়া করবেন!
রেজাউল হুদা কোকো
আমি ভীষন কস্ট পেলাম।পৃথীবিতে অনেক মিরাকেল ঘটনাই তো ঘটে।ভাইয়ের ক্ষেত্রে যদি এমনটাই হতো।ফিরে আসতেন হটাৎ কোন একদিন।যেখানেই থাকুন যেন ভালো থাকেন তিনি।
Hasin
Doa koren!
Mohd Abdul Hye
touching!
iqbal Mahmud
ei ghotona jeneo r karo life na ghote. Chotto ekta emotion kotoboro hote pare I can realize from life. Je ajo boye beracchi. Fhire ashuk se abar. Thank so much apa. Ami lekhata porte sahosh paini kono na kono karoner jonno. Amar keboli bhoy korto. Aaj porlam bhoye bhoye. Cant memorise.
হাসিন জাহান
You’re right 🙁