বেবি গাড়িতে না – বাড়িতে
গেল বছর রোজার মাসের এক শুক্রবারে আমার ছোট ছেলের জ্বর-ঠাণ্ডা, এজমা এটাক – একেবারে ছেরাবেরা অবস্থা! এর মাত্র একসপ্তাহ আগেই জ্বরে ভুগে ভালো হতে না হতেই রোজা রেখে প্রচণ্ড গরম আর এসির ঠান্ডায় এই দশা। ছেলের এ অবস্থা দেখে আমিতো সাথে সাথেই super mom এর রূপধারণ করলাম। কিন্তু শুক্রবারে ডাক্তার পাই কোথায়?
অনেকদিন থেকেই কুর্মিটোলা সরকারি হাসপাতালের সুনাম শুনেছি। এবার স্মার্টলী ইন্টারনেট থেকে নাম্বার বের করে ফোন করলাম। ডাক্তারকে বললাম: আমার বাচ্চার এজমা এটাক, দেখাতে চাই। উনি বিনয়ের সাথে বললেন যে, আজ শুধুমাত্র উনি একাই ডিউটিতে আছেন এবং উনার শিশুদের দেখার অভিজ্ঞতা নেই। আমি তাকে আশস্ত করলাম যে, আমার বাচ্চার বয়স বাইশ, অতএব উনার কোনো অসুবিধা হবে না। যাইহোক, কিছুক্ষণের মধ্যেই হাসপাতালে উপস্থিত হলাম। সে এক মহা হট্টগোল! নানান ধরনের রুগী, রেজিস্ট্রেশন করতে দুই নার্স হিমশিম খাচ্ছেন। সাথে ডাক্তারও হাত লাগাচ্ছেন। দেখে ভালো লাগলো। অবশেষে লাইন ধরে, ১০ টাকা ফি দিয়ে, ডাক্তারের কাছে হাজির হলাম। উনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে এন্টিবায়োটিক লিখে দিয়ে পরদিন একজন ‘প্রপার’ ডাক্তার দেখাতে বললেন।
পরদিন ইউনাইটেড হাসপাতালে নামকরা মেডিসিনের এক প্রফেসরের সাথে তিনটায় এপয়েনমেন্ট করলাম। ঘড়ি ধরে আড়াইটায় হাজির হয়ে রেজিস্ট্রেশন করে ডাক্তারের ফি-সমেত দুই হাজার টাকা জমা দিয়ে ঠিক তিনটায় তার রুমের সামনে হাজির হলাম। এজমার কথা শোনামাত্র তিনি বললেন, ওকে টেষ্ট করাতে হবে কিসে কিসে তার এলার্জী আছে, এবং কি পদ্ধতিতে সেই টেষ্টটা করতে হয়। উনি থামতে আমি জানালাম যে, ওটা অনেক আগেই করানো হয়েছে এবং সেই অনুযায়ী আমরা মেইন্টেইন করে চলি।তারপরও বছরে এক-আধ-বার এরকম হয়। যাহোক এবার তিনি বললেন, বড় হয়ে কারো এজমা হলে তার সেটা সারা জীবনই থাকে। সেক্ষেত্রে ওকে আরো দুটো টেষ্ট করাতে হবে – একটা ইসনোফিল আরেকটা কি যেন এক কঠিন নাম। তিনি জানালেন ইসনোফিল বেশি থাকলে অবশ্য তেমন কিছু করার নেই, তবে অন্যটা ধরা পড়লে সারাজীবন নিয়মিতভাবে একটা ইঞ্জেকশন দিতে হবে। ইঞ্জেকশনটা অবশ্য বেশ দামি। ৩০-৩৫ হাজার টাকা, সবাই এফোর্ড করতে পারে না। বলে সম্ভবত আড়চোখে আমার পোশাক-আশাক দেখে আমার আর্থিক অবস্থা যাচাই করার চেষ্টা করলেন। আমিও একটু সংকুচিত হলাম। তাড়াহুড়োতে ঠিকমতো কাপড়চোপড় পরে আসিনি। যাহোক, ডাক্তারকে বললাম গতকাল কুর্মিটোলার এমার্জেন্সিতে ওকে মক্সাক্লাভ দিয়েছে। শোনামাত্র উনি মহা বিরক্ত হয়ে বললেন: এন্টিবায়োটিক দিলেই তো হবে না, আগে টেস্ট করে তারপর দিতে হবে। গ্রাম পজিটিভ, গ্রাম নেগেটিভ এবং আরো অনেক ধরনের ব্যাক্টেরিয়া থেকে ইনফেকশন হতে পারে। ওর কফের কালচার করাতে হবে। বলেই ছেলের গলায় টর্চ মেরে বললেন: দেখেন, কেমন ইনফেকশন হয়ে আছে, আর সম্পূর্ণ উল্টো ওষুধ দেয়া হয়েছে। যাই হোক, আপাতত ওষুধ লিখে দিচ্ছি, কালচারের পরে দেখা যাবে। তথাস্তু। কফ কালচারে দিয়ে নতুন ওষুধ নিয়ে বাড়ি ফিরলাম!
Super mom -এর পারফরমেন্সে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেললাম, যাক, অবশেষে একজন ‘প্রপার’ ডাক্তার দেখানো গেছে। ওমা! সন্ধ্যাবেলায় ছেলে হাতে করে দুই ডাক্তারের ওষুধ নিয়ে এসে বল্লো: আম্মু, দুটো ওষুধই তো এক!!!
এবার গেল মাসের কথা। ঈদের পরদিন ছেলের সারারাত বমি, সকালে উঠে ডাক্তারের সন্ধান। এবার রক্ত পরীক্ষায় ধরা পড়লো জন্ডিস। সারারাত পেটে ব্যথায় ছটফট করেছে। আর ছোটবেলার মতো বলে: তুমি পাশে থাকলে একটু ভাল লাগে! সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে সকালে বুদ্ধি খুললো। মনে হলো হসপিটালে ভর্তি করালে বোধহয় একটা বিহিত হবে।
ঈদের পরপর ডাক্তার পাওয়া আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতই- তাদের অনেকেই এ সময় ব্যবসামন্দা থাকার সুবাদে, থুক্কু রোগীর আনাগোনা কম থাকায় চট করে বিদেশে ঘুরে আসেন। যাহোক, সাতসকালে উঠে পর্যবেক্ষণ করতে চলে এলাম বাড়ির কাছের এক হাসপাতালে। নতুন অবকাঠামো আর ঝকঝকে। রিসেপশনে ঢুকেই জানতে চাইলাম কোনো রেফারেন্স ছাড়া কি আমার বাচ্চাকে ভর্তি করাতে পারবো? কোনো ডাক্তার কি আছেন যিনি ভর্তি করালে এসে দেখবেন? শুনে উনি শশব্যস্ত হয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে বললেন: অবশ্যই! বাচ্চাদের জন্য আমাদের সার্বক্ষণিক ডাক্তারের ব্যবস্থা আছে। তা বেবী কি গাড়িতে?
ততক্ষণে আমার বোধদয় হলো। তেইশ বছরের দাড়িগোঁফওয়ালা, প্রায় ছয়ফুটি ছেলে আমার বাচ্চা হলেও, তাদের কাছে নয়! তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বললাম, বেবি গাড়িতে না, বাড়িতে!
MD.MASUM HOSSAIN
দারুণ! জীবন ঘনিষ্ঠ লিখা, মনে হচ্ছে এটাতো আমারই জীবনে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনা যা আমি সাহিত্যরস দিয়ে প্রকাশ করতে পারিনি।
আপা, প্লিজ বন্ধ করবেন না।
হাসিন জাহান
দোয়া করবেন!
sabrina
onek valo laglo lekha ta pora.
হাসিন জাহান
ধন্যবাদ!