ছিয়াশি হাজার টাকার এক্সপেরিয়েন্স
আমার ছোট ছেলে নেহায়েতই সাদাসিধা। ছোটবেলা থেকে কখনও কিছুর জন্য বায়না ধরেনি। অফিস থেকে ফিরলে ব্যাগের ভেতর চকলেট খোঁজেনি, ট্যুরে গেলে খেলনা আনার জন্য আবদার করেনি, বিদেশে গেলে কোনোরকম চাহিদাপত্র ধরিয়ে দেয়নি।
কর্মজীবী মা হিসেবে না চাইতেও সবসময় একটা অপরাধবোধে ভুগি। সেটা লাঘব করার প্রয়াসে একবার ঘোষণা দিলাম, “এবারের জন্মদিনে তুই যা চাইবি, সেটাই কিনে দেব।” ওমনি ধরা! সে একটা ল্যাপটপ চেয়ে বসলো। দাবি খুবই যুক্তিযুক্ত! লক্কর-ঝক্কর ডেক্সটপটায় গেম খেলা দুষ্কর। গুনে দেখি তখন ওর ‘ও লেভেল’ পরীক্ষার আর মাত্র ছমাস বাকি।
ছেলেকে বললাম পরীক্ষার আগে ল্যাপটপ কিনে দিলে রেজাল্ট খারাপ হবে না? সে নির্বিকারভাবে বললো, নাহ, এখন তো ডেক্সটপ আছে, কাজেই রেজাল্ট একইরকম হবে। কথায় যুক্তি আছে বটে!
কিন্তু আমি পড়লাম মহা বিড়ম্বনায়! সমস্যা অন্যখানে। পরীক্ষার আগে ল্যাপটপ কিনে দিলে বাড়িতে দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড হবে। কাজেই তার বাবার নজর এড়িয়ে লুকিয়ে ব্যবহার করতে হবে এই শর্তসাপেক্ষে একটা ল্যাপটপ কিনে আনলাম।
অতএব কিনে আনার পরে ল্যাপটপটা অবস্থান নিল ছেলের ঘরে লেপের তলায়। দিনরাতের একটা বড় সময়ে ওটা সেখানেই অবস্থান করে।
দেখতে দেখতে পরীক্ষা শেষ হলো, কিন্তু সমস্যা রয়েই গেল! গোপনে কেনা ল্যাপটপটা তো বের করা যাচ্ছে না! কারণ তখনও তো অংক, থুক্কু রেজাল্ট বাকি! কি হয় কে জানে! ফলাফল খারাপ হলে সব দোষ নন্দঘোষ। এই ঘটনা জানাজানি হলে সংবাদ শিরোনাম হবে, “চাকরিজীবী মায়ের অবহেলায় শিক্ষার্থী ছেলের করুণ পরিণতি!”
কাজেই বন্ধুর বাসায় গিয়ে ল্যাপটপ দিয়ে খেলা চলতে থাকলো। এক সন্ধ্যায় মুখ কালো করে ছেলে ঘরে ঢুকলো। আস্তে করে বললো, “আম্মু ছিনতাইকারি আমার ব্যাগ থেকে ল্যাপটপটা নিয়ে গেছে।” আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। আশ্বস্ত করে বললাম, “যাক এতদিনের লুকোচুরির হাত থেকে বাঁচা গেল! এবার ঘটা করে আমরা ল্যাপটপ কিনে আনবো। নতুনটা না কেনা পর্যন্ত আপাতত মোবাইলে গেম খেল।” জবাবে ততোধিক করুণ স্বরে বললো, “ওটাও তো নিয়ে গেছে!” এবার ভেতরে ভেতরে রীতিমতো আতংক অনুভব করলাম। পুরো ঘটনার বয়ান শুনে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, “ঘটনা যাইহোক তোর অন্তত লাখ টাকার এক্সপেরিয়েন্স হইছে!” ছেলে নিজের ঘরে ফিরে গেল। কিছুক্ষণের ভেতরে সে ছুটে এসে উত্তেজিত ভঙ্গিতে জানালো, “আম্মু, আমি হিসেব করে দেখেছি আমার আসলে এক লাখ টাকার না, এইটি সিক্স থাউজেন্ট টাকার এক্সপেরিয়েন্স হয়েছে!”
পাদটীকা: কথা সত্য! এক্সপেরিয়েন্স আমারও হয়েছে- সন্তানের উপর আস্থা রেখে বন্ধু হিসেবে বেড়ে উঠতে দেয়ার। এখন ছোটবেলার নানান ঘটনা নিয়ে আমরা খাস বাংলায় গল্প করে হেসে গড়াগড়ি যাই। বাকি গল্পগুলো পরবর্তী কোনো পর্বের জন্য তোলা থাকলো।
Ziaur Rahman
86,000